বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

অস্ত্র হাতে মাদক অভিযানে অংশ নিয়ে মন্ত্রিত্ব হারালেন ইশরাক


মানব খবর
ডেস্ক রিপোর্ট, ১১ ফলোয়ার
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০১ পিএম

অস্ত্র হাতে মাদক অভিযানে অংশ নিয়ে মন্ত্রিত্ব হারালেন ইশরাক
ইশরাক হোসেনের ফেসবুক পেজে মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছিল। সেখানে পিস্তলের ছবি অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়। তবে ভিডিওর কিছু অংশে আগ্নেয়াস্ত্রের স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রাজপথের আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল এবং প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই প্রতিমন্ত্রী হওয়া ছিল তাঁর বড় অর্জন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিতর্কে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হলো। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার বয়স আট মাস হয়েছে এবং এই মন্ত্রিসভায় ইশরাক হোসেনের মেয়াদও আট মাস। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন। তিনি ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘটনাটি শুধু একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না, এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা ও মন্ত্রীদের আচরণ কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে—সে বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটার পর থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। শক্তি প্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে রাজনীতিকেরা কতটা বের হতে পারলেন—এটাও মানুষ দেখতে চেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে এবং বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। এর মধ্যে গত মাসে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের পর কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত আসছে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁর কঠোর মনোভাব বজায় রেখেছেন, যা অন্যদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবেই দেখা উচিত। ৩৯ বছর বয়সী ইশরাক হোসেন ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর মারা যাওয়া অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হওয়ার পর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আইনি লড়াই শুরু করেন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ তাঁকে মেয়র ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও তাঁকে শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় এবং বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা ২০২৫ সালের মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। ইশরাকও আন্দোলনে যোগ দিয়ে সরকারের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য দেন এবং শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারি দেন। তাঁর যুক্তি ছিল আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং ঢাকাবাসীর ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে এই আন্দোলনের একদিকে তাঁর সমর্থকেরা এটিকে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখেছেন, অন্যদিকে নাগরিক সেবা বন্ধ করে জনভোগান্তির কারণে তাঁর সমালোচনাই হয়েছে বেশি এবং দলের ভেতরও তাঁর পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত ইশরাক মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি এবং ঘটনাটিকে অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবেই দেখেন।

ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে নিজেকে জাহির করতে চেয়েছিলেন বলেই মনে হয় কিন্তু অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতি কতটা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে তা হয়তো তিনি আমলেই নেননি। এই কর্মকাণ্ড যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিতর্ক তৈরি করতে পারে, তা–ও বিবেচনায় নেননি এবং মন্ত্রিসভার সদস্য কিংবা একজন রাজনীতিকের আচরণ ও ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা কত দূর পর্যন্ত যাওয়া উচিত সেই পরিমিতিবোধের অভাব লক্ষ করা গেছে ইশরাকের আচরণে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ইশরাক হোসেন ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্য দিয়ে বসেন। তাঁর বক্তব্যের পর উত্তেজনা আরও বাড়লে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং এনসিপি নেতা আখতার হোসেনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এর আগে গত জুলাইয়ে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে ইশরাক হোসেনেরও স্যালুট দেওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে উপহাস করা হয়।

ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা ও হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এবং তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা এবং বিশ্লেෂকেরা মনে করছেন, ইশরাককে পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্য বার্তা দিয়েছেন যে মন্ত্রীদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার কাউকে দায়মুক্তি দেবে না। তবে পদত্যাগের নির্দেশই চূড়ান্ত জবাব নয় এবং গেন্ডারিয়ার ঘটনায় আইন ভাঙা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারিত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা, স্থানীয় অভিযোগ এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর বিষয়েও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন এবং মাদক নির্মূলও জরুরি। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন যে ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা ও হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এবং তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে, আর প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা। ইশরাক শুধু প্রতিমন্ত্রী নন, সংসদ সদস্যও, ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেমে যাচ্ছে না কিন্তু অল্প সময়ে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার যে উদাহরণ, তা নিজের এবং ক্ষমতাসীন অন্যদের মধ্যে কতটা বোধ তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

এই সংবাদটি আপনার কেমন লেগেছে?


খবরটি রেটিং দিন

গড় রেটিং: ০/৫ (০ ভোট)

ধন্যবাদ! আপনার মতামত নেওয়া হয়েছে।

কালিয়াকৈরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবগঠিত কমিটির পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা

কালিয়াকৈরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবগঠিত কমিটির পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা

কালিয়াকৈরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবগঠিত কমিটির পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা

কালিয়াকৈরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবগঠিত কমিটির পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা

কালিয়াকৈরে কীটনাশক পানে গৃহবধূর মৃত্যু

কালিয়াকৈরে কীটনাশক পানে গৃহবধূর মৃত্যু

কালিয়াকৈরে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধে সয়লাব শিল্পনগরী, গিলে খাচ্ছে হাজারো মানুষের জীবন

কালিয়াকৈরে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধে সয়লাব শিল্পনগরী, গিলে খাচ্ছে হাজারো মানুষের জীবন

কালিয়াকৈর চন্দ্রা সরকারি কলেজে যুবদল নেতার উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান

কালিয়াকৈর চন্দ্রা সরকারি কলেজে যুবদল নেতার উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান

আলহাজ্ব শামসুল হক পালোয়ান: সততা ও সমাজসেবায় এক অনুকরণীয় নাম

আলহাজ্ব শামসুল হক পালোয়ান: সততা ও সমাজসেবায় এক অনুকরণীয় নাম

কালিয়াকৈর চন্দ্রা সরকারি কলেজে যুবদল নেতার উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান

কালিয়াকৈর চন্দ্রা সরকারি কলেজে যুবদল নেতার উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান

কালিয়াকৈরে ধর্ষণে পর রক্তক্ষরণে  প্রেমিকার  মৃত্যুর অভিযোগ, প্রেমিক গ্রেফতার

কালিয়াকৈরে ধর্ষণে পর রক্তক্ষরণে প্রেমিকার মৃত্যুর অভিযোগ, প্রেমিক গ্রেফতার

কালিয়াকৈরে শ্রমিক দলের বিক্ষোভ মিছিল

কালিয়াকৈরে শ্রমিক দলের বিক্ষোভ মিছিল

শ্রীবরদীতে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে কৃষক লীগ নেতা গ্রেপ্তার

শ্রীবরদীতে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে কৃষক লীগ নেতা গ্রেপ্তার

মানব খবর

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


অস্ত্র হাতে মাদক অভিযানে অংশ নিয়ে মন্ত্রিত্ব হারালেন ইশরাক

প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রাজপথের আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল এবং প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই প্রতিমন্ত্রী হওয়া ছিল তাঁর বড় অর্জন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিতর্কে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হলো। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার বয়স আট মাস হয়েছে এবং এই মন্ত্রিসভায় ইশরাক হোসেনের মেয়াদও আট মাস। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন। তিনি ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ঘটনাটি শুধু একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না, এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা ও মন্ত্রীদের আচরণ কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে—সে বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটার পর থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। শক্তি প্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে রাজনীতিকেরা কতটা বের হতে পারলেন—এটাও মানুষ দেখতে চেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে এবং বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। এর মধ্যে গত মাসে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের পর কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত আসছে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁর কঠোর মনোভাব বজায় রেখেছেন, যা অন্যদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবেই দেখা উচিত। ৩৯ বছর বয়সী ইশরাক হোসেন ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর মারা যাওয়া অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হওয়ার পর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আইনি লড়াই শুরু করেন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ তাঁকে মেয়র ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও তাঁকে শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় এবং বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা ২০২৫ সালের মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করে ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। ইশরাকও আন্দোলনে যোগ দিয়ে সরকারের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য দেন এবং শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারি দেন। তাঁর যুক্তি ছিল আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং ঢাকাবাসীর ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে এই আন্দোলনের একদিকে তাঁর সমর্থকেরা এটিকে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখেছেন, অন্যদিকে নাগরিক সেবা বন্ধ করে জনভোগান্তির কারণে তাঁর সমালোচনাই হয়েছে বেশি এবং দলের ভেতরও তাঁর পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত ইশরাক মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি এবং ঘটনাটিকে অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবেই দেখেন।

ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে নিজেকে জাহির করতে চেয়েছিলেন বলেই মনে হয় কিন্তু অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতি কতটা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে তা হয়তো তিনি আমলেই নেননি। এই কর্মকাণ্ড যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিতর্ক তৈরি করতে পারে, তা–ও বিবেচনায় নেননি এবং মন্ত্রিসভার সদস্য কিংবা একজন রাজনীতিকের আচরণ ও ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা কত দূর পর্যন্ত যাওয়া উচিত সেই পরিমিতিবোধের অভাব লক্ষ করা গেছে ইশরাকের আচরণে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ইশরাক হোসেন ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বক্তব্য দিয়ে বসেন। তাঁর বক্তব্যের পর উত্তেজনা আরও বাড়লে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং এনসিপি নেতা আখতার হোসেনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এর আগে গত জুলাইয়ে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে ইশরাক হোসেনেরও স্যালুট দেওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে উপহাস করা হয়।

ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা ও হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এবং তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা এবং বিশ্লেෂকেরা মনে করছেন, ইশরাককে পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্য বার্তা দিয়েছেন যে মন্ত্রীদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার কাউকে দায়মুক্তি দেবে না। তবে পদত্যাগের নির্দেশই চূড়ান্ত জবাব নয় এবং গেন্ডারিয়ার ঘটনায় আইন ভাঙা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারিত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা, স্থানীয় অভিযোগ এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর বিষয়েও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন এবং মাদক নির্মূলও জরুরি। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন যে ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা ও হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এবং তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে, আর প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা। ইশরাক শুধু প্রতিমন্ত্রী নন, সংসদ সদস্যও, ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেমে যাচ্ছে না কিন্তু অল্প সময়ে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার যে উদাহরণ, তা নিজের এবং ক্ষমতাসীন অন্যদের মধ্যে কতটা বোধ তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।


মানব খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক: খোরশেদ আলম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
অস্ত্র হাতে মাদক অভিযানে অংশ নিয়ে মন্ত্রিত্ব হারালেন ইশরাক
0:00 / 0:00
1x