উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
মানব খবর, ডেস্ক রিপোর্ট ||
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে হাজারো ফার্মেসি। চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক, কালিয়াকৈর বাজার, হরিণহাটি, সিনাবহ সহ প্রতিটি বাজারে, প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ২-৩টি করে ফার্মেসির দোকান। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ফার্মেসিগুলোর ৮০ ভাগই চলছে ক্লাস এইট / এস এস সি পাশ করা কর্মচারী দিয়ে। নেই কোনো ফার্মাসিস্ট, নেই কোনো ড্রাগ লাইসেন্স, নেই কোনো প্রশিক্ষণ। চলছে রমরমা ওষুধের ব্যবসা। আর এই ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খেয়ে প্রতিদিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে হাজারো গার্মেন্টস শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে। এ যেন এক নীরব ট্র্যাজেডি।আজ বৃহস্পতিবার(১অক্টোবর)কালিয়াকৈরে সফিপুর বাজারে রোজা মেডিসিন কর্নার ও সাগরিকা ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখার দায়ে দুটি ফার্মেসিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুন নাহার শিলা।সরেজমিনে দেখা যায়, সফিপুর বাজারের রোজা মেডিসিন কর্নারের ভিতরে তাকে তাকে সাজানো মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস্ট্রিক, জ্বর ও ব্যথার ওষুধ। সাধারণ মানুষের কাছে বেশি দামে এই ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছিল। সাগরিকা ফার্মেসিতেও একই চিত্র। ফ্রিজে রাখা ইনসুলিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৬ মাস আগে।অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সামনে অত্যন্ত কঠিন ও জোরালো ভাষায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামসুন নাহার শিলা বলেন,মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এটা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটা মানুষ হত্যার সামিল।আজ সফিপুরে দুটি ফার্মেসিতে আমরা দেখেছি, ফ্রিজে থাকা জীবন রক্ষাকারী ইনসুলিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৬ মাস আগে। গ্যাস্ট্রিক ও জ্বরের ওষুধের মেয়াদ শেষ এক বছর আগে। এই ওষুধগুলো যদি কোনো গর্ভবতী মা বা শিশু খায়, তাহলে তার কি হবে? তার কিডনি, লিভার নষ্ট হয়ে যাবে, সে মারা যাবে। এর দায় কে নেবে?আমি পরিষ্কার বলতে চাই - কালিয়াকৈরে কোনো ফার্মেসিতে যদি মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল ওষুধ পাওয়া যায়, সেই ফার্মেসি শুধু জরিমানা নয়, সিলগালা করে দেওয়া হবে এবং মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে।অনেক ফার্মেসি ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া, ফার্মাসিস্ট ছাড়া, ক্লাস এইট পাশ কর্মচারী দিয়ে ব্যবসা করছে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের ওষুধ বিক্রি করছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমাদের অভিযান চলবে। প্রতিটি বাজারে, প্রতিটি অলিগলিতে অভিযান চালানো হবে।আমি কালিয়াকৈরের ৬ লক্ষাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে বলবো - ওষুধ কেনার আগে মেয়াদ দেখুন। ভাউচার নিন। কোথাও সন্দেহ হলে উপজেলা প্রশাসনকে জানান।স্থানীয়দের অভিযোগ, কালিয়াকৈর উপজেলায় প্রায় হাজারো ফার্মেসি রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ লাইসেন্স আছে মাত্র ২০০-৩০০টির। বাকিগুলো চলছে ভুয়া লাইসেন্স ও ফটোকপি দিয়ে। ক্লাস এইট পাশ করা একজন কর্মচারী নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের ওষুধ, যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি করছে। কিছু ফার্মেসিতে মেয়াদ উত্তীর্ণ নকল ওষুধে সয়লাব। মেয়াদ শেষ হওয়া ওষুধের গায়ে নতুন স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফার্মেসি কর্মচারী বলেন, আমরা ক্লাস এইট পাশ, মালিক আমাদের ৮ হাজার টাকা বেতন দেয়। ডাক্তার আসে না, আমরাই ওষুধ দিই। মেয়াদ শেষ হলে মালিক বলে স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করতে।কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে ৬ লক্ষাধিক গার্মেন্টস শ্রমিকের বসবাস। তারা সামান্য জ্বর-কাশি হলেই এই ফার্মেসিতে ছুটে যান। ভুল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খেয়ে কিডনি, লিভার নষ্ট হয়ে অনেক শ্রমিক মৃত্যুর মুখে পড়ছেন। এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। সফিপুরের পোশাক শ্রমিক রিনা বেগম বলেন, আমার বাচ্চার জ্বরের জন্য ওষুধ নিয়েছিলাম, খেয়ে বমি শুরু হলো। পরে দেখি মেয়াদ শেষ হয়েছে এক বছর আগে।সচেতন মহলের দাবি,শুধু ৪০ হাজার টাকা জরিমানা নয়, এই মৃত্যুর ফার্মেসিগুলোকে সিলগালা করে মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে হবে। উপজেলা প্রশাসন ও ড্রাগ সুপারকে প্রতিটি ফার্মেসিতে অভিযান চালাতে হবে। অন্যথায় কালিয়াকৈর হবে মেয়াদউত্তীর্ণ- নকল ওষুধের মৃত্যুপুরী।